রাস্তা নির্মানের মাটি বিক্রি, গাছ বিক্রি, এফ্লুয়েন্ট ট্রিটমেন্ট প্লান্ট (ইটিপি) প্রকল্পে নয়ছয়, গ্যাসফিল্ডের মালিকানাধীন জমি থেকে মাটি বিক্রয় করে লাখ লাখ টাকা হাতিয়ে নিচ্ছেন অদৃশ্য ইশারায় কুমিল্লার মুরাদনগরের বাখরাবাদ গ্যাস ফিল্ড কোম্পানীর উপ-মহাব্যবস্থাপক জিয়াউল কবির। দিনের পর দিন অদৃশ্য ইশারায় লাখ লাখ টাকা হাতিয়ে নিলেও তিনি রয়েছেন ধরাছোয়ার বাহিরে। শিক্ষাজীবনে নিজেকে বুয়েট ছাত্রলীগের সভাপতি দাবী করে কর্মকর্তা কর্মচারীদের দিতেন হুমকি। কোন কর্মকর্তা কর্মচারী তার কথা না শুনলেই তাদের করতেন নানাভাবে হয়রানি। এছাড়া গ্যাসফিল্ডের ভেতরে কাঁকড়ি নামে নির্মিত প্রায় আড়াই কোটি টাকার বিলাসবহুল বাংলোতে থাকছেন একাই মাত্র ১৫’শ টাকা রাষ্ট্রীয় কোষাগারে জমা দিয়ে।
এ নিয়ে ফিল্ডে কর্মরত কর্মকর্তাদের মাঝেও রয়েছে চাপা ক্ষোভ। জিয়াউল কবির উপ-ব্যবস্থাপক, ব্যবস্থাপক, উপ-মহা ব্যবস্থাপক পদে গত ১৭ বছর যাবত কুমিল্লার মুরাদনগরের বাখরাবাদ গ্যাসফিল্ডের দায়িত্ব পালন করছেন এই কর্মকর্তা। আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় কমিটির বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিষয়ক সম্পাদক ও কুমিল্লা-১ আসনের আওয়ামী লীগ মনোনীত সাবেক এমপি ইঞ্জিনিয়ার আব্দুর সবুরের ঘনিষ্ঠ বলে পরিচয় দিতেন তিনি। এবং আওয়ামী সরকারের আমলে সচিব ও আওয়ামী লীগের বড় নেতাদের সাথে ছিলেন তার উঠাবসা। জিয়াউল কবিরের ব্যাক্তিগত ফেসবুক আইডিতে রয়েছে বঙ্গবন্ধু, ফ্যাসিস্ট সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও আওয়ামী লীগের সমর্থনে একাধিক পোস্ট ও আওয়ামী লীগের বিভিন্ন নেতার সাথে একাধিক ছবি।
সম্প্রতি বাখরাবাদ গ্যাসফিল্ডের প্রবেশ পথের প্রায় ২’শ ৪০মিটার রাস্তাসহ আংশিক ড্রেন ৫১ লাখ টাকা ব্যায়ে নির্মান কাজের কাজ পায় মের্সাস কাজী জাহাঙ্গীর ট্রেড লি:।
রাস্তাটির বক্স খনন করার পর উত্তেলিত মাটি প্রায় ১শ’ ট্র্যাক্টর ঠিকাদারের সাথে আঁতাত করে গ্যাসফিল্ড সংলগ্ন বল্লবদী গ্রামের জুলহাস মিয়ার পুত্র মুকবল হোসেনের কাছে বিক্রি করে দেয় গ্যাসফিল্ডের ডিজিএম জিয়াউল কবির। বর্তমানে মাটি বিক্রয়ের বিষয়টি জানাজানি হলে এ নিয়ে সাধারণ মানুষ সহ গ্যাসফিল্ডের কর্মকর্তা কর্মচারীর মধ্যে ক্ষোভ উত্তেজনা বিরাজ করছে।
সরকারি বা সরকার স্বায়ত্তশাসিত কোন প্রতিষ্ঠানের পুরাতন যন্ত্রপাতি, গাছ, মাটি ইত্যাদি বিক্রি করার পূর্বে দরপত্র প্রকাশ করে সরকারি নিয়মনীতি অনুযায়ী তা বিক্রি করতে হবে। কিন্তু জিয়াউল কবির তা না করে প্রভাব খাটিয়ে নিয়মনীতির তোয়াক্কা না করে এসব কাজ করে আসছেন। এছাড়াও জিয়াউল কবির বিভিন্ন অনিয়ম করতে গড়ে তুলেছেন গ্যাসফিল্ডের ভেতরে একাধিক
সিন্ডিকেট। এসব সিন্ডিকেটের মাধ্যমে অনিয়ম করে হাতিয়ে নিচ্ছেন লাখ লাখ টাকা।
সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, বাখরাবাদ গ্যাস ফিল্ডের সামনের প্রবেশমুখের রাস্তা থেকে খননকৃত মাটি কিনে নিয়ে বল্লবদী গ্রামের মুকবল হোসেন একটি ডোবা ভড়াট করেন।
রাস্তার মাটি দিয়ে কিভাবে ডোবা ভড়াট করলেন এ বিষয়ে জানতে চাইলে মুকবল হোসেনের কাছে তিনি জানান, তিনি মাটি দিয়ে ডোবাটি ভড়াটের বিষয়টি স্বীকার করে বলেন, আমি স্থানীয় হানিফ নামে এক মাটি ব্যবসায়ীর কাছ থেকে মাটি কিনেছি ডোবা ভড়াটের জন্য । এখানে হানিফ কোথায় থেকে মাটি এনে আমার কাছে বিক্রি করেছে তা আমি জানিনা। আমার মত অনেকেই এ সময় মাটি মাটি কিনেছ হানিফের কাছ থেকে।
রাস্তার মাটি অন্যত্রের বিক্রির বিষয়ে জানতে চাইলে বাখরাবাদ গ্যাস ফিল্ডের রাস্তা নির্মানের সাইড ইঞ্জিনিয়ার মো: সুমন বলেন, মাটি বিক্রয়ের বিষয়টি সঠিক নয়। এখানের সম্পূর্ণ কাজের দায়িত্ব ঠিকাদারের ওনি এ বিষয়ে বিস্তারিত বলতে পারবে।
এছাড়া ২০২৩-২৪ অর্থ বছরে নির্মিত এফ্লুয়েন্ট ট্রিটমেন্ট প্লান্ট (ইটিপি) স্থাপনের খননকৃত ঠিকাদারের সাতে আতাত করে মাটি একই সময়ে গ্যাসফিল্ডের ভেতরের পুকুরের প্যালাসাইডিং দেওয়াল নির্মান কাজের ঠিকাদার হুুমায়ন কবিরের কাছে বিক্রি করে দেন। পরে হুুমায়ন কবির তার প্যালাসাইডিং দেওয়াল সাপোর্ট দেওয়ার জন্য তার কাজের সাথে ধরা মাটি বাহির থেকে না কিনে ডিজিএমকে টাকা দিয়ে (ইটিপি) প্লান্টের মাটি দিয়ে তার বরাদ্দকৃত কাজ শেষ করেন। একই সময়ে জিয়াউল কবিরের নিজস্ব সিন্ডিকেটের মাধ্যমে বাখরাবাদ গ্যাসফিল্ডের নামে থাকা মুরাদনগর উপজেলার আলীরচর গ্রামের গোমতী নদী সংলগ্ন ৩৬একর জমির মাটি বিক্রি করেন।
একই সময়ে বাখরাবাদ গ্যাস ফিল্ডের সামনের রাস্তা নির্মাণের নামে রাস্তার দুপাশে থাকা ৫০ বছরের অধিক পুড়নো প্রায় ১২টি কড়ই গাছ কেটে বিক্রি করে দেন। পরবর্তীতে গাছের আলামত নষ্ট করার জন্য ক্রেনের সাহায্যে গাছের গোড়াগুলোকে উপড়ে ফেলা হয়। এবং বাখরাবাদ গ্যাস ফিল্ড এর ২ নম্বর ফিল্ডে ৪০ফিট লম্বা ওয়াসকো নামে একটি পরিত্যাক্ত কন্টেইনার ছিল। যাহা জিয়াউল কবির তার সিন্ডিকেটের মাধ্যমে সরিয়ে ফেলেন।
বাখরাবাদ বাজারের ব্যবসায়ী আক্তার হোসেন বলেন, রাস্তার মাটির ট্রাকে করে বাহিরে বিক্রি করার বিষয়টি সবাই জানে। তবে মাটিগুলো ডিজিএম বিক্রি করেছেন নাকি ঠিকাদার করেছে এ বিষয়ে বিস্তারিত কিছু জানিনা।
নাম প্রকাশ্যে অনিচ্ছুক বাখরাবাদ গ্যাসফিল্ডের এক কর্মকর্তা জানান, জিয়াউল কবির টাকার জন্য সব করতে পারেন। এখানে তার অনিয়মের কেহ প্রতিবাদ করতে পারে না, অনিয়মের প্রতিবাদ করলেই তাকে হয়রানি করা হয়। এছাড়া জিয়াউল কবির তার নিজস্ব সিন্ডিকেটের মাধ্যমে অনিয়ম করে হাতিয়ে নিচ্ছেন লাখ লাখ টাকা। তিনি নির্দিষ্ট সময়ে অফিস করেন না। সে বাংলোতে থাকেন সেখানেই অফিসের কাজগুলো করেন। রাতের বেলায় অফিসে এসে তার নিজস্ব কর্মকর্তাদের সাথে চায়ের আড্ডায় মাতেন। জিয়াউল কবির দিনের বেলায় ভুলক্রমে অফিসে আসলেও বেলা ৩টার আগে অফিসে আসেন না।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে বাখরাবাদ গ্যাস ফিল্ড কোম্পানির উপ-মহা ব্যবস্থাপক জিয়াউল কবির তার বিরুদ্ধে আমি তো সকল অভিযোগ অস্বীকার করে বলেন, এটা আমার বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র। দীর্ঘদিন যাবত একটি কুচক্রী মহল আমার বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র করছে। ওই কুচক্রী মহল এখন আমার বিরুদ্ধে মিথ্যা অপপ্রচার চালাচ্ছে। এখানে রাস্তার কাজ ঠিকাদার করছে, আমি মাটি বিক্রি করার কোন সুযোগ নেই। আমি সরকারি বাংলোতে থাকি সরকারিভাবে যা ভাড়া আসে তা পরিশোধ করে।
আপনার মতামত লিখুন :